কবি কাকতাড়ুয়ার জ্বর

১.

কবি কাকতাড়ুয়ার শেষতক জ্বরই বঁেধে গেল! একেবারে হুলুস্থুল জ্বর!

জ্বরে কঁাপতে থাকা কাকতাড়ুয়ার গায়ে হাত দিয়ে টুনটুনি তো ভয়ই পেয়ে গেল রীতিমতো। একটা কঞ্চিতে বসে বললো, Èএ তো ভয়ানক জ্বর! তখনই বলেছিলাম, একটা কচুপাতা এনে দিই। না তিনি শুনবেন না। বৃষ্টিতে ভিজতে নাকি বেজায় মজা। এবার বোঝো মজা কাকে বলে!’

মুখে রাগ দেখালেও টুনটুনির কিন্তু খুব কষ্ট হচ্ছিল কাকতাড়ুয়ার জন্যে। দিন নেই রাত নেই, বেচারাকে ঠায় দঁাড়িয়ে থাকতে হয় এই চকমকির মাঠে। খাটুনি তো কম নয়।

প্রজাপতিরও কষ্ট হচ্ছিল। রেগেমেগে বললো, Èমানুষগুলোও কিপটের একশেষ! একটা ছাতার ব্যবস্থা করলে কী এমন ক্ষতিই হতো! কাকতাড়ুয়া যে তাদের এতোগুলো ফসল পাহারা দিয়ে রাখছে তার কোনো মুল্যায়নই নেই!’

জ্বরে ঠকঠক করে কঁাপতে থাকলেও কাকতাড়ুয়ার হাসি পায়। ওর জন্যে যে সবাই এত ভাবে, সেটা এর আগে কখনো টের পায় নি সে। টুনটুনি ওর হাসি দেখে ভীষণ রেগে যায়, Èএটা কি হাসির কথা হলো? অমন বেকুবের মতো হাসবে না খবদ্দার। এমন জ্বর দুই দিন থাকলেই আর দেখতে হবে না!’

প্রজাপতিও তাতে সায় দেয়, Èহঁ্যা, দেখতে হবে না। সেবার আমার ভাইয়ের বন্ধুর বড় চাচার মেঝো সমু্বন্ধির এমন জ্বর হয়েছিল। সে-ও শরতের বৃষ্টিতে ভিজেছিল শখ করে। বেচারা তো ভুগতে ভুগতে নাজেহাল! শেষতক নাকি আর ভালো করে উড়তেই পারে না!’

Èবোঝো অবস্থা! শরতের বৃষ্টি কি যেনতেন ব্যাপার! বর্ষার বৃষ্টি হলে না হয় একটা কথা ছিল। তা বাপ তোমাকে কে বোঝাবে, তুমি কবি মানুষ! শরতের বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কবিতা লিখবে তুমি!’ ঝঁাঝালো কণ্ঠে কথাগুলো শুনিয়ে দেয় টুনটুনি।

কবিতার কথা শুনেই কাকতাড়ুয়ার মুখে হাসি খেলে যায়। বলে, Èহঁ্যা, হঁ্যা, একটা কবিতা লিখেছি তো! শুনবে তোমরা?’

Èমোটেও না, তোমার কবিতা তুমিই শোনো।’ বলে প্রজাপতি টুনটুনির দিকে ফিরে চায়। বলে, Èএ জ্বর তো এমনি এমনি সাড়ার নয়। এক কাজ করি চলো, গঙ্গা দা-র কাছে যাই। তিনি নিশ্চয়ই এর ভালো ওষুধ-পথ্যি দেবেন।’

টুনটুনি খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বলে, Èতা মন্দ বলো নি। তাই চলো।’ তারপর কাকতাড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, Èশুনলে তো কী বললাম? গঙ্গাদা-র কাছে যাচ্ছি। একটু পরই ফিরছি, আর বৃষ্টি এলে দয়া করে এই কচুপাতাটি মাথায় দেবে। না দিলে কিন্তু আমরা আর তোমার সাথে নেই।’ কথা শেষে প্রজাপতি আর টুনটুনি উড়ে গেল নদীর দিকটায়। ওদিকটার একটা ঝোপে গঙ্গাফড়িংয়ের আস্তানা। এই তল্লাটে ভালো ডাক্তার বলতে সে-ই একজন। প্রজাপতি আর টুনটুনির চলে যাওয়া দেখে কাকাতাড়ুয়া খানিক আগে লেখা একটা কবিতা আবৃত্তি করতে শরু করলো-

সবুজ মাঠে দঁাড়িয়ে থাকি, আকাশ ছিল নীল

শরত্ কালের সেই আকাশে কালো মেঘের মেয়ে

হঠাত্ এসে হল্লা করে, হাসে যে খিলখিল!

সেই হাসিতে বৃষ্টি নামে, আমরা উঠি গেয়ে∏

বৃষ্টির হাটে আজ হারাবই

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ…!

 

২.

গঙ্গাডাক্তার নাক থেকে চশমাটা ওপরে ঠেলে দিয়ে বললেন, Èপ্রজাপতি-টুনি, জ্বর কার শুনি?’ এই গঙ্গাডাক্তারও আবার আরেক মহাকবি! পদ্যের ভঁাজে ভঁাজে কথা বলা চাই তার। এমনকি প্রেসক্রিপশনও তিনি পদ্যের ছন্দে লিখে দেবেন!

টুনটুনি কাঠ হাসি হেসে বললো, Èজি দাদা, জ্বর তো ওই কাকতাড়ুয়ার। বেচারা তো এখানে আসতে পারে না। তাই আমরাই…’ কথা শেষ করতে পারে না সে, তার আগেই থামিয়ে দেয় গঙ্গাডাক্তার, Èআরে, আরে, তোমরা দেখছি পাজি হাড়ে হাড়ে! কবি কাকতাড়ুয়া জ্বরে, আর আমি কিনা ঘরে! চলো চলো শিগগির। জ্বর কতো ডিগগির?’

প্রজাপতি মুখ আমসি করে বলে, Èতা তো মেপে দেখিনি দাদা। আপনি গিয়েই নাহয় দেখুন।’

চশমাটা আরেকবার ওপরে ঠেলে দিয়ে গঙ্গাডাক্তার বলেন, Èতা তো দেখবই, তা তো দেখবই…!’ বলতে বলতে তার মুখ কঁুচকে আসে। মাঝে মাঝে ছন্দ মেলাতে না পারলে তার এমনটা হয়। মেজাজ তখন সপ্তমে চড়ে যায়। তাই পরিচিতরা সে সময় কেউ ঘাটাতে যায় না তাকে!

পথে কোনো রকম টঁু শব্দ না করে কাকতাড়ুয়ার কাছে সাততাড়াতাড়ি ছুটে আসে সবাই। কাকতাড়ুয়ার শুকনো মুখ দেখে গঙ্গাফড়িং আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না, কবিতার ছন্দে বললেন, Èওহে কবি, কী করে এমন হলো? ইতিহাসের ঝঁাপি খোলো।’

কাকতাড়ুয়াকে রোগের ইতিহাস বলতে হলো না। টুনটুনি ডানা ঝাপটে বললো, Èকেমন করে আর, আজ সকালে যে বৃষ্টিটা হলো, তাতে ইচ্ছে করে ভিজেই এই দশা।’

কথাগুলো শুনেই গঙ্গাফড়িংয়ের চোখ কপালে উঠলো, চশমা রইলো আগের জায়গায়! Èবলে কী, বলে কী! ভয়ানক তথ্য!’ বলে গঙ্গাডাক্তার একবার আকাশে তাকান, একবার পাতালে তাকান। তারপর মাথা চুলকে বলেন, Èএ জ্বরের আছে এক অদ্ভুত পথ্য!’

Èকী পথ্য?’ প্রজাপতি জানতে চায়। গঙ্গাডাক্তার আর কিছু না বলে গম্ভীর মুখে কাকতাড়ুয়াকে টিপেটুপে দেখে খানিকক্ষণ ভাবেন। ভাবাভাবি শেষ হলে একসময় সঙ্গে নিয়ে আসা একটা কদম পাতায় প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করেন। লেখা শেষ হলে টুনটুনির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, Èপড়ো।’

টুনটুনি জোরে জোরে পড়ে, Èশরতের বৃষ্টিতে বঁেধে গেলে জ্বর, শরতের মেঘ খাবে অতিসত্বর।’ পড়া শেষ হলে টুনটুনি অবাক চোখে সবার দিকে তাকায়, এ তো কঠিন ওষুধ! সেই মেঘরাজ্যে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে! এখন উপায়?

 

৩.

টুনটুনি চিনি্তত মুখে বললো, Èমেঘরাজ্য কি তোমার পাশের বাড়ি! ওই অতোদূরে তো বাপু আমি যেতে পারবো না। শালিকও তো অতোদূর উড়তে পারে না। একমাত্র ঈগলই পারে এই কাজ করতে।’

Èওরেব্বাপরে ওই পাজির কথা আর বলো না! বদের হঁাড়ি একটা। আমাদের দেখলেই তো ওর চোখ চকচক করে ওঠে। ওর ধারেকাছে ঘেষার জো নেই কারও।’

কাকতাড়ুয়া একটা হাই তুলতে তুলতে বলে, Èআরে বাবা, বাদ দাও না! এমনি এমনিই সেড়ে উঠবো আমি। তারচেয়ে বরং একটা কবিতা বলি শোনো…’

ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে প্রজাপতি হঠাত্ চঞ্চল হয়ে ওঠে। বলে, Èআরে! দেখো দেখো!’ দূরের কদম গাছটার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল ও। সেদিকটাতে সবার চোখ চলে যায়। টুনটুনিও চিত্কার করে ওঠে, Èআরে, এ যে দেখছি ঘুড়ি ভাই!’

লাল সবুজ একটা ঘুড়ি তখন কদমগাছে বসে জিড়িয়ে নিচ্ছিল। প্রায়ই সে এদিকটাতে ঘুরতে আসে। আর সব দিন একটা সুতো বঁাধা থাকে তার সঙ্গে। কিন্তু আজ সে মুক্ত। মনের আনন্দে ঘুরতে ঘুরতে তাই এদিকপানেই উড়ে এসেছে সে। টুনটুনি, প্রজাপতি আর কবি কাকতাড়ুয়ার সঙ্গে তার ভালো খাতির। ওদেরকে অমন চঁেচাতে দেখে ঘুড়ি হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে। টুনটুনি, প্রজাপতি আর কাকতাড়ুয়া আনন্দে আরো জোরে জোরে হই হল্লা করতে থাকে, Èঘুড়ি ভাই, ঘুড়ি ভাই, শুনে যাও, শুনে যাও!’

ঘুড়িটা চটজলদি উড়ে এসে হুস করে কাকতাড়ুয়ার হাতের ওপরে ঝুলে পড়ে। একগাল হেসে বলে, Èভাইসব, আজ থেকে আমি মুক্ত! যখন যেখানে খুশি উড়ে বেড়াতে পারবো!’

ওর কথা শুনে টুনটুনি, প্রজাপতি আর কাকতাড়ুয়া একযোগে বলে ওঠে, Èহিপ হিপ হুররে!’ কাকতাড়ুয়া তার সঙ্গে পদ্য মেলায়, Èঘুড় ঘুড় ঘুড়রে, ঘুড়ি যাবে দূর রে, মন ফুর ফুররে!’

কাকতাড়ুয়ার কবিতা শেষে একপ্রস্থ তালি। তালির পরে টুনটুনি বলে, Èমুক্ত তো হলে। এবার একটা উপকার করতে হয় যে, ঘুড়ি ভাই।’

Èকী উপকার? বলেই দেখো না।’

Èকাকতাড়ুয়ার তো অনেক জ্বর। গঙ্গা ডাক্তার বলেছে, শরতের মেঘ খেলেই এই জ্বর সারবে। জানো তো শরতের মেঘ মিলবে সেই মেঘরাজ্যে। কিন্তু অতো দূরে যাওয়ার সাধ্য তো আমাদের নেই। তুমি কি একবার মেঘরাজ্যে যাবে, ঘুড়ি ভাই?’

Èকেন নয়? কাকতাড়ুয়ার জ্বর, আর আমি বসে থাকবো! কোনও চিন্তা কোরো না। এই যাবো আর আসবো।’ বলেই ঘুড়ি তার বাতাস গাড়ি স্টার্ট দিলো। উড়তে উড়তে একসময় সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল সে। বাকি তিনজন অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকপানে।

 

৪.

মেঘরাজা তার পাকানো গঁোফ দুটোতে চাড় দিতে দিতে বললেন, Èএক টুকরো কেন, চাইলে এক বস্তা মেঘ নিয়ে যাও না!’

Èনা, না রাজামশাই, এক টুকরো হলেই হবে। আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দিই…।’ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে ঘুড়ি।

মেঘরাজা একগাল হেসে বলেন, Èধন্যবাদ দিয়ে বাপু কী হবে। তুমি এসেছো, তাতেই আমরা খুশি। আর কবি কাকতাড়ুয়া তো আমাদের নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন। তার জন্যে এতোটুকু করতে না পারলে তো আমাদের মান থাকে না!’ এতটুকু বলে গলা খাকারি দিয়ে একটা হঁাক দেন তিনি, Èওরে কে আছিস, এক টুকরো মেঘ নিয়ে আয় দেখি। ঘুড়ি মিয়া সেই কতোদূর থেকে এসেছে।’

বলতে না বলতেই একজন পেয়াদা এক টুকরো মেঘ নিয়ে এলো হাতে করে। ঘুড়ি তা হাতে নিতেই বিমোহিত হয়ে গেল চমত্কার একটা ঘ্রাণে। আরো অবাক হলো, মেঘের ওজনের বহর দেখে, একদম শনপঁাপড়ির মতো হালকা! বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই ঘুড়ি আর দেরি করে না। রাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিচে নামতে থাকে তুমুল গতিতে। নামতে থাকে, নামতে থাকে। এক মেঘরাজ্য পেরিয়ে আরেক মেঘরাজ্য। এভাবে নামতে নামতে এক সময় সবুজ মাঠটা চোখে পড়ে তার। একসময় কাকতাড়ুয়াকেও স্পষ্ট দেখতে পায় সে। তখন খুব আনন্দ হয় ঘুড়ির। একটু নেচে নেয় মনের আনন্দে। পাক খেতে খেতে নেমে আসে বন্ধুদের কাছে। আর ঘুড়িকে দেখা মাত্রই সবাই আরেকবার চঁেচিয়ে ওঠে∏Èহিপ হিপ হুররে’ বলে।

ঘুড়ি নেমে এলে সবাই আর দেরি না করে সেই এক টুকরো মেঘ কাকতাড়ুয়াকে খাইয়ে দেয় ঝটপট। কাকতাড়ুয়া তখনও জ্বরের ঘোরে কবিতা আওড়ায়, Èআমাদের ছোট মেঘ, চলে ভেসে ভেসে…।’ তবে মেঘটুকু খাওয়ানোর পরই কাকতাড়ুয়ার জ্বরের ঘোর গেল টুটে। জ্বর গেল পালিয়ে দূরের তেপান্তরে!

তা দেখে সবার মুখেই হাসি ছড়িয়ে পড়লো। কবি কাকতাড়ুয়ার মনে তখন ফের কবিতার ভাব এসে গেছে। আশপাশে সবাই চঁেচামেচি করছে। কিন্তু তাতে কোনো ভাবান্তর হয় না তার। মনে মনে একটা কবিতাও লিখে ফেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে। তারপর জোরে জোরে আবৃত্তি করতে শুরু করে∏

আমরা চারজন সবুজ মাঠে হাওয়ার সাগরে ভাসি,

ভাসতে ভাসতে কবি হয়ে যাই, বিকেল গড়িয়ে চলে।

আমরা তখনও হইচই করি, আমরা তখনও হাসি

রাতের আকাশে লক্ষ তারা কত কিছু যে বলে!

তারাদের হাটে আজ হারাবো

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ…!

Advertisements

শীতবুড়োর ঠান্ডা লেগেছিল

টুনটুনদের উঠোন পেরিয়ে, পুকুর পেরিয়ে, ঝোপঝাড় আর হঁাড়িঝোলানো খেজুরগাছগুলো পেরিয়ে ঝমুঝুমির মাঠ। সেই মাঠের ঠিক মধ্যিখানে একটা শিউলিফুলের গাছ। দেখতে চিকন-চাকন হলেও পুরো শরত্-হেমন্ত আর শীতের শুরুতে খুব ভোরবেলা অগুণতি ফুল ঝরে গাছটার ডাল-পালা থেকে। সাদা সাদা শিউলিফুলগুলো সবুজ ঘাস আর শিশির খুব পছন্দ করে। আর টুনটুন পছন্দ করে ফুলগুলোকে। তাই সে প্রতিদিন ভোরবেলা সবুজ সবুজ অন্ধকারে উঠোন পেরিয়ে, পুকুর পেরিয়ে, ঝোপঝাড় আর খেজুরগাছগুলো পেরিয়ে ছুটে যায় সেখানে। টুনটুন জানে, রাতের তারাগুলোই সকালে এভাবে শিউলিফুল হয়ে ঝরে পড়ে।

বাড়িতে টুনটুনের দুই দঁাতঅলা দুই বুড়ো দাদু আছে। একজন হলো তার ছোট্ট-পুচ্চি ভাই, যার কেবল দুটি দঁাতই উঠেছে। আরেকজন হলো তার বুড়ো দাদুভাই, যার পড়তে পড়তে কেবল দুটি দঁাতই অবশষ্টি আছে! সেই যে রাতের তারাগুলো, সকালে শিউলিফুল হয়ে মাঠের সবুজ ঘাসে ঝরে পড়ে, সেগুলো কুড়িয়ে এনে দুই বুড়ো দাদুকে দেয় টুনটুন। ফুল পেয়ে দুজনই ফোকলা মুখে হেসে দেয়। টুনটুনের তখন ভারি আনন্দ হয়।

কদিন ধরে টুনটুনের মনটা খুব খারাপ, শিউলিগাছটারও! মাঠের সবুজ ঘাসগুলোও কেমন মনমরা ভাব নিয়ে দঁাড়িয়ে থাকে। সেদিন ভোরে একটানা খুক-খুক-খুক কাশির শব্দ শুনে চমকে ওঠে টুনটুন। মনে মনে ভাবে, Èকে এত কাশে?’ ভাবা ভাবির মাঝে মা ডেকে বলেন, Èশীত এসেছে রে টুনটুন, এত ভোরে বাইরে যাসনে। দেখ না সবার কেমন ঠান্ডা লেগেছে। গরম কাপড় পড়ে পড়তে বস।’

টুনটুন তবু মায়ের বারণ না মেনে চুপিচুপি বাইরে চলে এলো। এক দেৌড়ে ঝুমঝুমির মাঠে। চারপাশে মশারির মতো কুয়াশা ঝুলে আছে। দুই হাত দূরেরও কিছু ঠাওর করা যায় না। আন্দাজে হঁাটতে থাকে টুনটুন। এমন সময় খুক-খুক কাশির শব্দ শুনতে পায় ও। অবাক কান্ড! এত্ত কুয়াশায় কাশি নিয়ে মাঠের মধ্যিখানে কে? কেৌতূহলে এগিয়ে যায় ও, Èকে কাশে, ওখানে?’ প্রশ্ন করে টুনটুন।

ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় কেউ, কিন্তু কাশির চোটে কথা আটকে যায়, কিছুই বোঝা যায় না। কেবল খুক-খুক-খুক! আরও দুই পা এগিয়ে যেতেই টুনটুন বেশ ভিরমি খায়। থুত্থুড়ে এক বুড়ো লাঠিতে ভর দিয়ে ওর দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। লোকটার চুল-দাড়ি-ভ্রু∏সব কুয়াশার মতো সাদা!

বাতাসে বুড়োর গঁোফজোড়া ঠিক কাশফুলের মতো কঁাপছিল। তা দেখে হাসি পেল টুনটুনের। হেসেও দিল ফিক করে। ওকে হাসতে দেখে কটমটিয়ে তাকাল বুড়ো। কপালে গুনে গুনে দশটা ভঁাজ পড়ল। আবার কী যেন বলতে গিয়েই বিপত্তি। খুক খুক কাশি উঠে গেল তার! হা করে তাকিয়ে রইল টুনটুন। কাশি কমে এলে খানিকটা দম নিয়ে চোখ বড় বড় করে বুড়ো বলল, Èঅন্যের কষ্ট দেখে হাসা হচ্ছে! বলি আদবকেতা কিছু শেখায়নি কেউ!’

টুনটুন মিনমিনে গলায় বলল, Èনা মানে, ইয়ে মানে, তোমার গঁোফ…! মানে তুমি কে, বুড়ো দাদু? এর আগে এই তল্লাটে তোমাকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না! আর এত কাশি নিয়ে এখানে দঁাড়িয়ে আছো কেন, শুনি?’

বুড়ো কটমটে দৃষ্টি স্বাভাবিক করে কঁাপতে কঁাপতে বলল, Èতা বাপু আমায় চিনবে কী করে! আমি থাকি ওই যে দূরে, হিমালয়ে। নাম আমার শীতবুড়ো।’

Èশীতবুড়ো? তোমার কথা কত্ত শুনেছি!’ চোখ বড় বড় করে বলল টুনটুন। শীতবুড়ো খুশি হয়ে মাথাটা এপাশ-ওপাশ দুলিয়ে বলল, Èতা তো শুনবেই, তা তো শুনবেই!’

বুড়োকে এত খুশি হতে দেখে টুনটুনের হঠাত্ সন্দেহ হয়। চোখ ছোট ছোট করে বলে, Èতো তুমি যদি শীতবুড়োই হবে, তাহলে খুক খুক করে কাশছো কেন?’

বুড়োর মুখটা মলিন হল এবার, Èআর বোলো না বাপু, ঝোলাভর্তি শীত ছড়াতে ছড়াতে কখন যে আমার বুকেও খানিকটা ঢুকে পড়েছে, টেরই পাইনি একদম! চোখ দুটি বেজায় ভোগাচ্ছে।’ এতটুকু বলে আবার কাশতে থাকে শীতবুড়ো। কাশি থামলে একটু দম নিয়ে বলে, Èতা বাপু, তোমার কাছে এই বিতিকিচ্ছিরি ঠান্ডা-কাশির ওষুধ হবে?’

সন্ধ্যায় বই সামনে নিয়ে পড়ার কথা ভুলে যায় টুনটুন। উঠোন থেকে নাড়া পোড়ানোর মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগে ওর। আর কানে লাগে খুক খুক খুক কাশির শব্দ। এখনও কাশছে ওর দুই বুড়ো দাদু। ওদিকে শীতবুড়ো বেচারাও নাজেহাল। ছটফট করতে থাকে টুনটুন। মনে হয় ওর মাথাটা ঝোলাভর্তি কুয়াশায় ঠাসা! কী যে করবে ও! তখন হঠাত্ একটা বুদ্ধি খেলে যায় ওর মাথায়। ভেবে দেখে, বাবা তো আজ হাট থেকে কাশির ওষুধ এনেছে। তাই খঁুজে পেতে একটা বোতলে সেখান থেকে কিছুটা ওষুধ ঢেলে রাখে টুনটুন।

 

ওষুধটা এক চুমুকে শেষ করে হাতের চেটোতে মুখ মুছে খুব সুন্দর করে হাসে শীতবুড়ো, Èওষুধ এত মিষ্টি হয়!’

টুনটুন মিষ্টি করে হেসে বললো, Èতঁেতো ওষুধও আছে!’

শীতবুড়ো টুনটুনকে আদর করে বলল, Èতঁেতো ওষুধ আছে কিনা জানি না, তবে ওষুধটা ঠিক তোমার মতোই মিষ্টি গো বাপু!’

শীতবুড়োর কথায় ফের মিষ্টি করে হাসে টুনটুন।

সেদিন থেকে টুনটুনের দুই দঁাতঅলা দুই বুড়ো দাদু খুক খুক করে কাশল না, কাশল না তলাটের আর কোনো ছেলে-বুড়ো, এমনকি শীতুবুড়োও!